বাবর আজমের বিশ্ব রেকর্ড: বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে স্টিভ স্মিথের পাশে পাকিস্তানি তারকা
বাবর আজমের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন: স্মিথের রেকর্ডে ভাগ বসালেন পাকিস্তানি সেনসেশন
ইনজুরির কারণে বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে মাঠে নামতে পারেননি পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের মূল স্তম্ভ বাবর আজম। তবে দ্বিতীয় টেস্টে দলে ফিরে তিনি প্রমাণ করলেন কেন তাকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে গণ্য করা হয়। রাওয়ালপিন্ডিতে যখন পাকিস্তান দল চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে, ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাবর। আর এই লড়াকু ইনিংস খেলার পথেই তিনি নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়, স্পর্শ করেছেন আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম কিংবদন্তি স্টিভ স্মিথের এক বিশাল মাইলফলক।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (WTC) ইতিহাসে বাবর আজম এখন সর্বোচ্চ হাফ-সেঞ্চুরিকারীদের তালিকায় ওপরের সারিতে। বাংলাদেশের বিপক্ষে তার ৩১তম টেস্ট হাফ-সেঞ্চুরিটি ছিল WTC আসরে তার ২০তম অর্ধশতক। এই কৃতিত্বের মাধ্যমে তিনি অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ স্মিথ এবং ইংল্যান্ডের জ্যাক ক্রলির পাশে জায়গা করে নিয়েছেন। বর্তমানে WTC ইতিহাসে বাবর, স্মিথ এবং ক্রলি যৌথভাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ ফিফটির মালিক।
Babar Azam [Source: AFP]
অভিজাত তালিকায় বাবর আজম
বাবর আজম তার ৩৯তম বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে এই মাইলফলকে পৌঁছান। তার সামনে এখন কেবল দুজন ক্রিকেটার রয়েছেন—জো রুট এবং উসমান খাজা। রুটের আধিপত্য এই তালিকায় প্রশ্নাতীত হলেও, বাবর যেভাবে এগোচ্ছেন তাতে রেকর্ডটি খুব দ্রুতই নিজের করে নেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বাবরের এই ধারাবাহিকতা পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের জন্য বড় স্বস্তির খবর। বিশেষ করে যখন দল বড় সংগ্রহের পেছনে ছুটছে এবং প্রতিপক্ষের বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নিচ্ছে।
ম্যাচের প্রেক্ষাপট: খাদের কিনারা থেকে পাকিস্তানের উত্তরণ
বাংলাদেশের ছুড়ে দেওয়া প্রথম ইনিংসের ২৭৮ রানের জবাবে পাকিস্তান ইনিংসের শুরুটা ছিল ভয়াবহ। স্কোরবোর্ডে মাত্র ২৩ রান উঠতেই দুই ওপেনার সাজঘরে ফিরে যান। তাসকিন আহমেদের গতি আর সুইংয়ের সামনে পাকিস্তানি টপ-অর্ডার যখন দিশেহারা, তখন উইকেটে আসেন বাবর আজম। কোনো রকম আতঙ্ক ছাড়াই তিনি বাংলাদেশের বোলারদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন।
বাবর আজম যখন আউট হন, তখন তার ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছিল ৮৪ বলে ৬৮ রান। তার এই ধ্রুপদী ইনিংসে ছিল ১০টি দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি। বাবরের ট্রেডমার্ক কাভার ড্রাইভ এবং নিখুঁত টাইমিং দর্শকদের পুরোনো বাবরের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। ক্রিজে যতক্ষণ ছিলেন, মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ দলের মোমেন্টাম তিনি একাই ছিনিয়ে নিয়েছেন। তার সাথে সালমান আঘা ১৯ রানে অপরাজিত থেকে দলের হাল ধরেন। পাকিস্তান বর্তমানে ১৪০/৪ স্কোরে অবস্থান করছে এবং এখনো ১৩৮ রানে পিছিয়ে রয়েছে।
লিটন দাসের অনবদ্য সেঞ্চুরি এবং বাংলাদেশের লড়াই
পাকিস্তানের ব্যাটিং বিপর্যয়ের আগে বাংলাদেশ দল তাদের প্রথম ইনিংসে লিটন দাসের অনবদ্য ব্যাটিংয়ে ভর করে ২৭৮ রান সংগ্রহ করে। লিটন দাস যখন ক্রিজে এসেছিলেন, তখন বাংলাদেশ ১১০ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল। সেখান থেকে ১৫৯ বলে ১২৬ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন এই উইকেটকিপার-ব্যাটার। তার ইনিংসে ছিল ১৬টি চার এবং দুটি বিশাল ছক্কা। লিটনের এই লড়াইয়ের কারণেই বাংলাদেশ একটি সম্মানজনক পুঁজি পায়।
পাকিস্তানের হয়ে বোলিং ইউনিটে উজ্জ্বল ছিলেন খুররম শাহজাদ। তিনি চারটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট শিকার করেন। এছাড়া অভিজ্ঞ মোহাম্মদ আব্বাস তিনটি উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশকে চাপে রাখার চেষ্টা করেন। তবে লিটনের মাস্টারক্লাস ইনিংসের সামনে পাকিস্তানি বোলারদের লড়াই কিছুটা ম্লান হয়ে যায়।
বাবরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ব্যক্তিগত রেকর্ড এবং ফিফটির মাইলফলক অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার, কিন্তু বাবর আজম এবং পাকিস্তানের লক্ষ্য এখন অনেক বড়। সিরিজ সমতায় ফেরাতে হলে পাকিস্তানকে এই ইনিংসে বড় লিড নিতে হবে। যদিও বাবর ফিফটি করে আউট হয়ে গেছেন, তবে তার রেখে যাওয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে সালমান আঘা এবং লোয়ার অর্ডার ব্যাটারদের বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, বাবর আজমের এই ৬৮ রানের ইনিংসটি কেবল কিছু রান নয়, বরং এটি ছিল তার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার একটি বড় সুযোগ। সমালোচকদের কড়া জবাব দিয়ে বাবর আবারও বুঝিয়ে দিলেন, কন্ডিশন যাই হোক না কেন, তিনি পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের আসল ভরসা। এখন দেখার বিষয়, সিলের এই উইকেটে বাবর আজমের এই রেকর্ড গড়া ইনিংসটি পাকিস্তানকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিতে পারে কি না।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে সর্বোচ্চ ফিফটির সংক্ষিপ্ত তালিকা:
- জো রুট: শীর্ষস্থান
- উসমান খাজা: দ্বিতীয় স্থান
- বাবর আজম, স্টিভ স্মিথ ও জ্যাক ক্রলি: ২০টি ফিফটি (যৌথভাবে তৃতীয়)
পাকিস্তানের এই সিরিজ বাঁচানোর লড়াইয়ে বাবর আজমের ফর্ম ধরে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে হলে এই ম্যাচে জয়ের কোনো বিকল্প নেই শান মাসুদের দলের কাছে।
