আইপিএল টিকিট কালোবাজারি চক্রে ডিডিসিএ কর্মকর্তাদের নাম, দিল্লি পুলিশের নোটিশ
Contents
আইপিএল টিকিট কালোবাজারি কাণ্ডে ডিডিসিএ কর্মকর্তাদের জড়িয়ে পড়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএল মানেই ক্রিকেট প্রেমীদের কাছে এক উৎসব। কিন্তু এই উৎসবের আড়ালে যে কত বড় দুর্নীতির জাল বিছানো থাকে, তা সম্প্রতি দিল্লি পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে। আইপিএল টিকিটের কালোবাজারি এবং প্রিমিয়াম পাসের অবৈধ বিক্রির অভিযোগে দিল্লি অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (ডিডিসিএ) কর্মকর্তাদের নাম জড়িয়ে পড়েছে। দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ ইতিমধ্যে এই তদন্তে যোগ দেওয়ার জন্য চারজন ডিডিসিএ কর্মকর্তাকে নোটিশ পাঠিয়েছে।
অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামের বাইরে থেকে চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর এই পুরো বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ রয়েছে যে, এই ব্যক্তিরা স্টেডিয়ামের ভেতর থেকে পরিচালিত বেটিং বা জুয়া সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছে চড়া দামে টিকিট এবং ম্যাচ পাস বিক্রি করত। এই গ্রেপ্তার এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
কিভাবে চলত এই বিশাল কালোবাজারি চক্র?
দিল্লি পুলিশের অপরাধ শাখার ডিসিপি সঞ্জীব কুমার যাদব জানিয়েছেন যে, অভিযুক্তরা ডিডিসিএ প্রশাসন এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিত। এটি তাদের ক্রেতাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে সাহায্য করত। তদন্তে দেখা গেছে, অভিযুক্তরা প্রায় ২০,০০০ টাকায় কমপ্লিমেন্টারি পাস বা সৌজন্যমূলক টিকিট বিক্রি করত। শুধু তাই নয়, সাধারণ টিকিটের দামও কয়েক গুণ বাড়িয়ে কালোবাজারে বিক্রি করা হতো।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, এই কালোবাজারি থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের একটি বড় অংশ ডিডিসিএ-র কিছু কর্মকর্তার সাথে ভাগ করে নেওয়া হতো। এই চক্রটি শুধুমাত্র ক্রিকেট ভক্তদের ঠকানো নয়, বরং স্টেডিয়ামের ভেতর অনলাইন বেটিং বা জুয়া খেলা চক্র, এমনকি পকেটমার এবং অন্যান্য অপরাধীদের কাছেও টিকিট সরবরাহ করত।
আইপিএল ২০২৬-এর ফাইনালে কালোবাজারির প্রভাব
টিকিট কালোবাজারির এই ব্যাপকতা এবং এর সাথে কর্মকর্তাদের যোগসাজশ আইপিএলের ভবিষ্যৎ আয়োজনের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। বিসিসিআই (BCCI) পরিচালিত কমিটি ২০২৬ আইপিএলের ফাইনাল ম্যাচটি বেঙ্গালুরুর এম. চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম থেকে সরিয়ে আহমেদাবাদে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মূলত নিরাপত্তার খাতিরে এবং টিকিট বন্টনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে যে, বেঙ্গালুরুতেও রাজ্য প্রশাসনের সাথে যুক্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে টিকিট কালোবাজারে চলে যেত। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে ভেন্যু স্থানান্তর করাকে এই সিন্ডিকেটগুলোর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশজুড়ে বিস্তৃত কালোবাজারির জাল
টিকিট কালোবাজারির এই সমস্যাটি শুধুমাত্র দিল্লির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এপ্রিল মাসে বেঙ্গালুরুর এম. চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে আরসিবি বনাম এলএসজি ম্যাচের সময় একজন ক্যান্টিন কর্মীকে ১৮০টিরও বেশি টিকিট কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কর্পোরেট নামে বড় আকারে টিকিট কিনে সেগুলো ১৯,০০০ টাকা পর্যন্ত দামে রিসেল বা পুনরায় বিক্রি করা হতো।
একইভাবে হায়দ্রাবাদেও সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ বনাম কেকেআর ম্যাচের সময় পুলিশ একটি চক্রের সন্ধান পায়। সেখানে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয় যারা সৌজন্যমূলক টিকিট চড়া দামে বিক্রি করছিল। ডিসিপি যাদব আরও জানিয়েছেন যে, দিল্লির ধৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব এবং হরিয়ানাতেও টিকিট কালোবাজারির মামলা রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে এটি একটি আন্তঃরাজ্য অপরাধমূলক সিন্ডিকেট।
গ্রেপ্তার এবং উদ্ধারকৃত সরঞ্জাম
তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার পঙ্কজ যাদব নামে আরও এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যিনি একটি পেট্রোল পাম্পের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতেন। তার আগে গত শুক্রবার স্টেডিয়ামের বাইরে থেকে উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লির আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ তাদের কাছ থেকে ৫৫টি আইপিএল ম্যাচের টিকিট এবং ৩৩টি কমপ্লিমেন্টারি পাস উদ্ধার করেছে।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন যে, এই সিন্ডিকেটের সাথে আর কারা যুক্ত আছেন। ডিডিসিএ কর্মকর্তাদের এই তদন্তে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা ক্রিকেট মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সাধারণ দর্শকদের টিকিট পাওয়ার ভোগান্তি এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দুর্নীতির এই মেলবন্ধন আইপিএলের মতো একটি বড় টুর্নামেন্টের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
উপসংহার
ক্রিকেট প্রেমীদের আবেগকে পুঁজি করে এই ধরণের কালোবাজারি চক্র দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়। তবে এবার ডিডিসিএ কর্মকর্তাদের নাম সরাসরি জড়িয়ে পড়ায় প্রশাসনের কঠোর হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। দিল্লি পুলিশের এই নোটিশ এবং বিসিসিআই-এর ভেন্যু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ক্রিকেটের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়। আইপিএল ২০২৬ এর আগে এই চক্রগুলো নির্মূল করা না গেলে, সাধারণ দর্শকদের জন্য মাঠে গিয়ে খেলা দেখা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
