আইপিএল ছাড়ার নেপথ্যে লিটন দাসের অজানা গল্প: বিসিবি ও কেকেআরের সেই আক্ষেপ
Contents
আইপিএল থেকে লিটনের বিদায়: পর্দার আড়ালের সত্য
২০২৩ সালের আইপিএল ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য অনেক বড় একটি প্রত্যাশা। লিটন দাস যখন কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে সুযোগ পেলেন, তখন সবার মনেই ছিল বড় কিছু করার আশা। কিন্তু সেই স্বপ্নের যাত্রা শেষ হয়েছিল দ্রুতই। সম্প্রতি বিসিবির পডকাস্ট ‘চার-ছক্কা’-তে লিটন দাস তার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন, যা ক্রিকেট বিশ্বে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এনওসি জটিলতা ও বিসিবির ভূমিকা
লিটন দাসের মতে, আইপিএল থেকে তার ফিরে আসার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল বিসিবির কাছ থেকে পুরো সময়ের জন্য এনওসি (NOC) না পাওয়া। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলতে লিটনকে বোর্ডের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছি, তাই আমি জানি এটা কেমন অনুভূতি। আইপিএলে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সুযোগ পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর। আমি অনেকবার বোর্ডের কাছে অনুরোধ করেছিলাম আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টটি বাদ দেওয়ার জন্য, কিন্তু বোর্ড অটল ছিল।’
কেকেআরের সাথে দূরত্বের শুরু
বোর্ড যখন লিটনকে পুরো সময়ের এনওসি দেয়নি, তখন কেকেআর কর্তৃপক্ষের সাথেও তার সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। লিটন ব্যাখ্যা করেন যে, আইপিএলের মতো টুর্নামেন্টে পুরো মৌসুম থাকা একজন খেলোয়াড়ের জন্য শেখার বড় সুযোগ। তার মতে, ‘সাকিব আল হাসান বা মোস্তাফিজুর রহমান এমনি এমনি বিশ্বমানের হননি। তারা বিশ্বের সেরা সব লিগে খেলে নিজেদের প্রস্তুত করেছেন। খেলোয়াড়রা যদি এই ধরনের বড় লিগে খেলার সুযোগ পায়, তবে তাদের তা দেওয়া উচিত। কারণ এটি শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের জন্যই কাজে আসে।’
মানসিকভাবে অপ্রস্তুত ছিলেন লিটন
লিটন স্বীকার করেছেন যে, আইপিএলে যাওয়ার সময় তিনি মানসিকভাবে খুব একটা প্রস্তুত ছিলেন না। এর পেছনে কারণ ছিল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ধোঁয়াশা। ‘আমি মনে করি না আমি কলকাতার জন্য মানসিকভাবে তৈরি ছিলাম। আয়ারল্যান্ড সিরিজের জন্য আমাকে আটকে রাখার কারণে আমার মনোযোগ ঠিক ছিল না। সেই সময় আমরা অনেক কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারিনি, কারণ বাংলাদেশের ক্রিকেট তখন শুধু জেতার নেশায় মত্ত ছিল, খেলোয়াড়দের উন্নয়নের দিকে তেমন নজর ছিল না,’ লিটন যোগ করেন।
কেকেআর ড্রেসিংরুম ও সেই ম্যাচ
কলকাতা নাইট রাইডার্সে নিজের প্রথম অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে লিটন জানান, তিনি আইপিএলের ডাক পাওয়ার পর অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। কিন্তু দলে গিয়ে তিনি ভিন্ন চিত্র দেখেন। তার ভাষ্যমতে, ‘আমি এমন একটি দলে গিয়েছিলাম যেখানে ভেবেছিলাম খেলার সুযোগ পাব। কিন্তু যাওয়ার পর দেখলাম সেখানে আমার জন্য তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই। দল যেন আমাকে ঠিকমতো প্রয়োজন বোধ করছিল না।’
সেই ম্যাচের প্রস্তুতির কথা স্মরণ করে লিটন বলেন, ‘সাধারণত কোনো খেলোয়াড়কে আগের দিন জানিয়ে দেওয়া হয় যে সে পরের ম্যাচে খেলবে। আমি দুই ম্যাচ বসে ছিলাম, কেউ আমার সাথে কোনো কথা বলেনি। হঠাৎ রাত ১১টার সময় আমাকে মেসেজ দেওয়া হয় যে আমি খেলছি। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেই দিনটি আমার ছিল না। ক্রিকেট কখনো আপনার সাথে থাকে, আবার কখনো থাকে না।’
ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা
লিটনের এই মন্তব্য বিসিবির খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। একজন ক্রিকেটার যখন দেশের বাইরে বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করতে যান, তখন বোর্ডের পক্ষ থেকে মানসিক ও প্রশাসনিক সমর্থন কতটা জরুরি, তা লিটনের এই অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে বিসিবি এমন কঠোরতা কমিয়ে খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের পথে আরও নমনীয় হবে, যাতে লিটনের মতো অন্য কোনো প্রতিভাবান ক্রিকেটারকে মাঝপথে স্বপ্ন বিসর্জন দিতে না হয়।
