শান্ত’র সেঞ্চুরিতে আবাহনীর বিশাল জয়: ডিপিএল-এ অগ্রণী ব্যাংককে ৯ উইকেটে বিধ্বস্ত
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল) নিজেদের অপ্রতিরোধ্য ফর্ম বজায় রেখে আবাহনী লিমিটেড আরও একবার তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। একপেশে এক ম্যাচে অগ্রণী ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাবকে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি। এই জয়ের প্রধান কারিগর ছিলেন দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, যিনি ব্যাট হাতে উপহার দিয়েছেন এক অনবদ্য সেঞ্চুরি। শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল আবাহনী, আর শান্তর অতিমানবীয় ব্যাটিং তাদের জয়কে করে তুলেছে আরও সহজ ও স্বস্তিদায়ক। মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটি আবাহনীর জন্য ছিল আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর এক দারুণ মঞ্চ। তারা কেবল জয়ই ছিনিয়ে আনেনি, বরং নিজেদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে টুর্নামেন্টে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে।
Contents
অগ্রণী ব্যাংকের ইনিংস: শুরুটা ভালো হলেও ছন্দপতন
ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয় অগ্রণী ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব। তাদের শুরুটা মন্দ ছিল না। দুই ওপেনার মাহফিজুল ইসলাম রবিন এবং সাদমান ইসলাম দলকে একটি মোটামুটি ভালো সূচনা এনে দেন। আক্রমণাত্মক মেজাজে ব্যাট করে মাহফিজুল ইসলাম রবিন ৩৩ বলে ৩১ রানের একটি ঝোড়ো ইনিংস খেলেন, যেখানে বেশ কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারির মার ছিল। অন্যদিকে, সাদমান ইসলাম ২৫ বলে ১৭ রান করে তাকে কিছুটা সঙ্গ দেন। মনে হচ্ছিল, অগ্রণী ব্যাংক হয়তো বড় সংগ্রহের দিকেই এগোচ্ছে।
তবে, এই ভালো শুরু বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি অগ্রণী ব্যাংক। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পতন শুরু হয়। ইম্রুল কায়েস ইনিংসের হাল ধরার চেষ্টা করেন এবং ৪৯ বলে ৩০ রানের একটি দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেন, কিন্তু তার একার পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। মধ্যম সারির ব্যাটসম্যানরা কেউই উইকেটে থিতু হতে পারেননি এবং আবাহনীর বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে তারা অসহায় আত্মসমর্পণ করেন।
একপ্রান্ত আগলে রেখে দারুণ লড়াই চালিয়ে যান দলের অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান নাসির হোসেন। তিনি ৫৮ বলে ৫৬ রানের একটি অসাধারণ অর্ধশতক হাঁকান, যা অগ্রণী ব্যাংকের ইনিংসকে কিছুটা সম্মানজনক স্কোরের দিকে নিয়ে যায়। নাসির তার ইনিংসে কিছু চমৎকার শট খেলেন, কিন্তু অন্যপ্রান্ত থেকে যোগ্য সঙ্গীর অভাবে তার এই লড়াই ব্যর্থ হয়ে যায়। তার বিদায়ের পর অগ্রণী ব্যাংকের লোয়ার অর্ডার দ্রুত গুটিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত, অগ্রণী ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব ৪২.১ ওভারে মাত্র ১৭৮ রানে অলআউট হয়ে যায়, যা আবাহনীর মতো শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে একটি নিতান্তই মামুলি স্কোর ছিল।
আবাহনীর বোলারদের দাপট
আবাহনীর বোলাররা এদিন ছিলেন দারুণ ছন্দে। বিশেষ করে পেসার খালেদ আহমেদ তার আট ওভারের স্পেলে মাত্র ২১ রান খরচ করে ২টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন, যা ছিল এদিন সবচেয়ে মিতব্যয়ী বোলিং। তার সুইং এবং গতি অগ্রণী ব্যাংকের ব্যাটসম্যানদের বেশ ভুগিয়েছে। এছাড়া, অন্যান্য বোলাররাও নিজেদের দায়িত্ব সুচারু রূপে পালন করেন এবং প্রতিপক্ষকে বড় স্কোর গড়তে দেননি। সম্মিলিত বোলিং প্রচেষ্টায় আবাহনী শুরু থেকেই চাপ বজায় রাখতে সক্ষম হয়, যার ফলস্বরূপ অগ্রণী ব্যাংক প্রত্যাশিত রান তুলতে ব্যর্থ হয়।
আবাহনীর লক্ষ্য তাড়া: শান্ত ও অঙ্কনের অবিচ্ছিন্ন জুটি
১৭৯ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে আবাহনী শুরুতেই একটি ধাক্কা খায়। দলীয় মাত্র ৮ রানে ওপেনার জিশান আলম ৬ রান করে আউট হয়ে যান। মনে হচ্ছিল, হয়তো ম্যাচটি কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। কিন্তু এরপর যা ঘটলো, তা ছিল শুধুই আবাহনীর আধিপত্যের চিত্র। উইকেটে আসেন দলের দুই স্তম্ভ, নাজমুল হোসেন শান্ত এবং মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন।
এই দুজন মিলে গড়ে তোলেন ১৭৯ রানের এক অবিচ্ছিন্ন পার্টনারশিপ, যা ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে দেয়। নাজমুল হোসেন শান্ত শুরু থেকেই ছিলেন সাবলীল। তিনি তার স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক এবং দৃষ্টিনন্দন ব্যাটিংয়ে মাঠের চারপাশে রান তুলতে থাকেন। মাত্র ৯০ বলে ১০৮ রানের এক ঝোড়ো কিন্তু দৃষ্টিনন্দন অপরাজিত সেঞ্চুরি হাঁকান তিনি, যেখানে ছিল বেশ কয়েকটি বাউন্ডারি এবং ছক্কা। তার স্ট্রোক প্লে ছিল দেখার মতো, এবং তিনি যেন অগ্রণী ব্যাংকের বোলারদের নিয়ে ছেলেখেলা করছিলেন। এই সেঞ্চুরিটি শুধু তার ব্যক্তিগত মাইলফলকই ছিল না, এটি আবাহনীর জয়ের পথকেও সুগম করে তোলে।
অন্যপ্রান্তে মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন শান্তকে যোগ্য সঙ্গ দেন। তিনি ৮৬ বলে ৫৬ রানের এক শান্ত ও পরিপক্ক অপরাজিত ইনিংস খেলেন। অঙ্কন কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সিঙ্গেলস এবং ডাবলস নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখেন এবং শান্তকে তার নিজস্ব খেলা খেলার স্বাধীনতা দেন। তাদের বোঝাপড়া ছিল অসাধারণ, যা অগ্রণী ব্যাংকের ফিল্ডারদের হতাশ করেছে। এই জুটি আবাহনীকে মাত্র ৩১.৪ ওভারেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেয়।
একপেশে জয় এবং ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
আবাহনী লিমিটেড ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে এই ম্যাচ জিতে নেয়, যা তাদের ডিপিএল শিরোপার দৌড়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরি এবং মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনের দৃঢ় ব্যাটিং এই জয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই জয় আবাহনীর আত্মবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দেবে এবং তাদের বাকি টুর্নামেন্টের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে। তাদের বোলারদের দক্ষতা এবং ব্যাটসম্যানদের দুর্দান্ত ফর্ম প্রমাণ করে যে তারা এই মৌসুমের অন্যতম শক্তিশালী দল। এই ধরনের পারফরম্যান্স দিয়ে আবাহনী নিঃসন্দেহে শিরোপার অন্যতম দাবীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই ম্যাচটি দেখিয়ে দিল যে আবাহনী শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং একটি দল হিসেবে তারা কতটা সুসংগঠিত এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে জয়ের জন্য কতটা বদ্ধপরিকর।
