Mo Bobat: RCB ‘walk towards pressure situations rather than away from them’ – রজত পাতিদারের রূপান্তর ও আরসিবির ফাইনাল যাত্রা: মো বোবাটের বিশ্লেষণ
Contents
- 1 আইপিএল ২০২৬ কোয়ালিফায়ার ১: রজত পাতিদারের সেই বিধ্বংসী ইনিংস
- 2 রজত পাতিদারের বিবর্তন ও মো বোবাটের মূল্যায়ন
- 3 পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা ও গিয়ার পরিবর্তন
- 4 তারকা নির্ভরতা থেকে ‘কমপ্লিট টিম’ হয়ে ওঠা
- 5 চাপের মুখে বুক চিতিয়ে লড়াই করার মানসিকতা
- 6 ভেঙ্কটেশ আইয়ারের অনবদ্য অবদান ও ত্যাগ
- 7 লক্ষ্য এবার ‘অ্যাটাকিং চ্যাম্পিয়ন্স’ হওয়া
আইপিএল ২০২৬ কোয়ালিফায়ার ১: রজত পাতিদারের সেই বিধ্বংসী ইনিংস
আইপিএল ২০২৬-এর কোয়ালিফায়ার ১-এ গুজরাট টাইটান্সের (জিটি) বিরুদ্ধে রজত পাতিদারের ইনিংস চলাকালীন এমন একটি মুহূর্ত এসেছিল, যখন প্রতিপক্ষ বোলারদের কাছে আর কোনো উত্তর ছিল না। এটি কেবল তাঁর বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের জন্য নয়, বরং পাতিদার যেভাবে পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে নিজের খেলার গিয়ার পরিবর্তন করেছিলেন, তা ছিল অবিশ্বাস্য। জেসন হোল্ডারের জোড়া ধাক্কার পর যখন আরসিবি কিছুটা চাপে পড়েছিল, তখন পাতিদার প্রথমে ১১ বলে ১৬ রান করে ইনিংস পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তেই তিনি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা বোলিং আক্রমণকে তছনছ করে দেন। তাঁর এই আগ্রাসী ব্যাটিং গুজরাট টাইটান্সের সমস্ত পরিকল্পনাকে মাঠের মধ্যেই ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল।
এই দুর্দান্ত ইনিংসটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন ভারতের নতুন দুই বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চক্র শুরু হতে যাচ্ছে এবং পাতিদারকে জাতীয় দলে অভিষেক—এমনকি নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়ার দাবিও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। রেকর্ড বই ঘাঁটলে দেখা যাবে, আইপিএল ২০২৬-এ আরসিবির হয়ে রান সংগ্রাহকদের তালিকায় তিনি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। ১৯৬.৭৬-এর অবিশ্বাস্য স্ট্রাইক রেটে তিনি ইতিমধ্যে ৪৮৩ রান সংগ্রহ করেছেন।
রজত পাতিদারের বিবর্তন ও মো বোবাটের মূল্যায়ন
আরসিবির ক্রিকেট ডিরেক্টর মো বোবাটের মতে, এই ইনিংসটি পাতিদারের ক্রমাগত উন্নতির এবং পরিপক্বতার অন্যতম বড় প্রমাণ। টানা দ্বিতীয়বারের মতো আইপিএল ফাইনালে ওঠার পর বোবাট বলেন, ‘সে বর্তমানে দুর্দান্ত ব্যাটিং করছে এবং পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই তা করে দেখিয়েছে। আজকের এই কোয়ালিফায়ার ম্যাচে চাপ সামলে দাঁড়িয়ে যাওয়াটা সত্যিই বিশেষ কিছু ছিল এবং আমি নিশ্চিত সে নিজেও এই পারফরম্যান্সে ভীষণ খুশি হবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘যে দলের অধিনায়ক বা প্রধান ব্যাটার ফর্মে থাকে, সেই দল স্বভাবতই বাড়তি আত্মবিশ্বাস পায়। আমরা এখন তাঁর কাছ থেকে এই ধরনের ইনিংস দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। সে কিছু অসাধারণ শট খেলেছে, তবে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল তাঁর আগ্রাসী মনোভাব—যা সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার আদর্শ উদাহরণ।’
গত দুই মৌসুমে পাতিদারের খেলার স্টাইল কীভাবে উন্নত হয়েছে, তা নিয়ে একটি মজার স্মৃতি রোমন্থন করেন বোবাট। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমার মনে আছে গত মৌসুমে একসময় আমি তাকে স্পিন-বাশার (স্পিন ধ্বংসকারী) বলেছিলাম। এতে সে কিছুটা বিরক্ত হয়েছিল কারণ আমি হয়তো বোঝাতে চেয়েছিলাম সে কেবল স্পিনের বিপক্ষেই ভালো খেলে। এখন হয়তো সে আমাকে ভুল প্রমাণ করতেই এই ধরনের ব্যাটিং করছে!’
বোবাট আরও জানান, ‘সে দীনেশ কার্তিক (ডিকে) এবং অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের সাথে নিজের খেলা নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। রজতের একটি বিশেষ গুণ হলো, সে বলের টাইমিং খুব ভালো করতে পারে। পেস হোক বা স্পিন, ফ্রন্ট ফুট বা ব্যাক ফুট—বল প্রায় সময়ই তাঁর ব্যাটের মাঝখানে লাগে। এটি একজন ভালো ব্যাটারের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। তাঁর ব্যাটিংয়ের মূল ভিত্তি বা বেসিকস অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাঁর মধ্যে কোনো ভয় নেই। গত কয়েক বছর ধরে আমরা এই নির্ভীক মানসিকতাকেই আমাদের দলের পরিচয় হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।’
পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা ও গিয়ার পরিবর্তন
গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে পাতিদারের ইতিবাচক মানসিকতা আরসিবির ইনিংসের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। শেষ ওভারগুলোতে তাঁর ঝোড়ো ব্যাটিং জিটি-কে এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দেয় যা একসময় তাদের নাগালের মধ্যে মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তা পাহাড়সম চাপে পরিণত হয়।
পাতিদারের এই পরিপক্বতা সম্পর্কে বোবাট বলেন, ‘এই বছর সে যে জিনিসটি সবচেয়ে ভালো করেছে তা হলো নিজের মুহূর্তটি বেছে নেওয়া। আমার মনে আছে এই মৌসুমের শুরুর দিকে রাজস্থান রয়্যালসের (আরআর) বিরুদ্ধে ম্যাচে আমরা দ্রুত কিছু উইকেট হারিয়েছিলাম। সে শুরুতে চাপ সামলে নেয় এবং এরপর ধীরে ধীরে রানের গতি বাড়ায়। এর জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল চিন্তাভাবনা এবং পরিস্থিতি বোঝার পরিপক্বতা।’
তিনি আজকের ম্যাচ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আজকের পরিস্থিতিও অনেকটা একই রকম ছিল। টপ অর্ডারের তিন ব্যাটারের ভালো শুরুর পর আমরা দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারাই। রজত বুঝতে পেরেছিল যে সেখানে ইনিংসটি একটু ধরে খেলার প্রয়োজন ছিল এবং এরপর সে আবার আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করে। পরিস্থিতি এবং পিচ বুঝে কখন গিয়ার বাড়াতে হবে আর কখন একটু ধীরস্থির হতে হবে—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই তাঁর উন্নয়নের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক অংশ।’
তারকা নির্ভরতা থেকে ‘কমপ্লিট টিম’ হয়ে ওঠা
পাতিদারের এই উন্নতি যেন আরসিবি দলের নিজস্ব বিবর্তনেরই একটি প্রতিচ্ছবি। বছরের পর বছর ধরে আরসিবি মূলত তাদের বড় তারকাদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এখন দলের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি খেলোয়াড়ই দলের জয়ে অবদান রাখছেন।
বোবাট বলেন, ‘আমি বিশেষভাবে আনন্দিত যে আমাদের দলের অনেকেই ম্যাচ জয়ে অবদান রাখছে। লোকে যখন কমপ্লিট টিম বা একটি সম্পূর্ণ দলের কথা বলে, আমি এই বিষয়টিকেই নির্দেশ করি। গত বছরও আমাদের খেলার ধরন এমনই ছিল। আমরা ব্যাটিং বা বোলিংয়ে কেবল একজন বা দুজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরশীল নই। টুর্নামেন্টে অনেক দূর যেতে হলে এমন যৌথ পারফরম্যান্সেরই প্রয়োজন হয়।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আজকের ম্যাচের কথাই যদি বলি, ফলাফল যাই হোক না কেন, যারা সুযোগ পেয়েছে তারাই প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার চেষ্টা করেছে। আমরা এভাবেই আমাদের ক্রিকেট খেলি। সবাই যদি নিজের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করে, তবে ফলাফল নিজের নিয়মেই আসবে।’
চাপের মুখে বুক চিতিয়ে লড়াই করার মানসিকতা
মো বোবাটের মতে, অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মেলবন্ধনে দলের এই নতুন পরিচয় গড়ে উঠেছে, যারা প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে নিজেদের প্রমাণ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘বড় ম্যাচে অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অনেক বেশি, তবে এটি তাদের ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্রের দৃঢ়তাকেও ফুটিয়ে তোলে। বিরাট কোহলি দলে কী নিয়ে আসে তা সবাই জানে—তাঁর তীব্রতা, তাঁর লড়াই করার ক্ষমতা এবং রানের ক্ষুধা। কিন্তু দলের বাকিরাও নিজেদের মতো করে একই রকম সাহসী।’
ক্রুণাল পাণ্ডিয়া সম্পর্কে বোবাট বলেন, ‘ক্রুণাল এমন একজন খেলোয়াড় যার মধ্যে লড়াই করার এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা প্রচুর রয়েছে। সে সবসময় কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে জড়াতে চায়। ভুবনেশ্বর কুমার এবং জশ হ্যাজেলউড কিছুটা শান্ত প্রকৃতির হলেও তারাও চাপের মুখে দাঁড়িয়ে পারফর্ম করতে ভালোবাসে। আপনি যদি এমন একটি দল গঠন করতে পারেন যেখানে খেলোয়াড়রা চাপ থেকে পালিয়ে না গিয়ে চাপের মুখোমুখি দাঁড়াতে চায়, তবে তা দলের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।’
ভেঙ্কটেশ আইয়ারের অনবদ্য অবদান ও ত্যাগ
দলের এই লড়াকু মনোভাবের আরেকটি বড় উদাহরণ হলেন ভেঙ্কটেশ আইয়ার। আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা এবং আইপিএল জেতার রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও এই মৌসুমের শুরুতে তাঁকে সাইডবেঞ্চে বসে কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু টুর্নামেন্টের দ্বিতীয়ার্ধে দলে সুযোগ পাওয়ার পর থেকে তিনি বিভিন্ন পজিশনে ব্যাটিং করে অসামান্য পারফর্ম করেছেন।
আরসিবির হয়ে অভিষেকের পর তিনি ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসেবে নেমে দলের বিপর্যয় সামাল দেন। গত সপ্তাহে পাঞ্জাব কিংসের (পিবিকেএস) বিরুদ্ধে রজত পাতিদারের অনুপস্থিতিতে ৪ নম্বরে ব্যাটিং করে অপরাজিত ৭৩ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেন। এরপর সানরাইজার্স হায়দরাবাদের (এসআরএইচ) বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে এবং আজ গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে কোয়ালিফায়ার ১-এ তিনি ওপেনিং করতে নামেন। তাঁর এই বহুমুখী ব্যাটিং দক্ষতা ও পারফরম্যান্সের কারণে দল ফিল সল্টের আঙুলের চোটজনিত অনুপস্থিতির ধাক্কা খুব সহজেই সামলে নিতে পেরেছে।
আইয়ার সম্পর্কে বোবাট আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘ভেঙ্কির ব্যাপারে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি আমি বলব, তা হলো তাঁর মনোভাব ছিল অসাধারণ। যে খেলোয়াড় ভারতের হয়ে খেলেছেন এবং আইপিএল ট্রফি জিতেছেন, তাঁর জন্য বেঞ্চে বসে থাকা সহজ নয়। কিন্তু সে কখনোই তা প্রকাশ পেতে দেয়নি।’
তিনি আরও একটি ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমার মনে আছে মৌসুমের শুরুতে তিন নম্বর পজিশনে দেবদত্ত পাডিক্কাল নাকি ভেঙ্কটেশ আইয়ার খেলবেন তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। যখন দেব রান করছিল, ডাগআউট থেকে সবচেয়ে জোরে চিৎকার করে হাততালি দিচ্ছিল ভেঙ্কি। এটিই তাঁর চরিত্র এবং আমাদের দলের ভেতরের সুন্দর পরিবেশকে ফুটিয়ে তোলে। সে নিজে খেলছে না তা মেনে নিয়েও সতীর্থের সাফল্যে আনন্দিত হয়েছিল। সে অনুশীলনে কঠোর পরিশ্রম করেছে, নিজের সুযোগের জন্য অপেক্ষা করেছে এবং সুযোগ পাওয়ার পর তা কাজে লাগিয়েছে। আজ প্রথম বল থেকেই সে এবং বিরাট কোহলি মিলে ম্যাচের সুর বেঁধে দিয়েছিল এবং গুজরাট টাইটান্সকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে আমরা তাদের ওপর চড়াও হতে আসছি।’
লক্ষ্য এবার ‘অ্যাটাকিং চ্যাম্পিয়ন্স’ হওয়া
এই একটি বাক্যই সম্ভবত আরসিবির এই মৌসুমের পুরো গল্পটিকে তুলে ধরে। ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচ-উইনার, ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্ব, কিন্তু সবার লক্ষ্য একটাই—দলের সেই নির্দিষ্ট পরিচিতি ধরে রাখা। আর এই লড়াকু মানসিকতাই আজ তাদের চেন্নাই সুপার কিংস (সিএসকে) এবং মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের (এমআই) পর তৃতীয় দল হিসেবে আইপিএল ট্রফি ধরে রাখার স্বপ্নের মাত্র এক ধাপ দূরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
রজত পাতিদারের ভাষায়, আরসিবি এখন কেবল চ্যাম্পিয়ন নয়, বরং মাঠে বুক চিতিয়ে লড়াই করা এক ‘অ্যাটাকিং চ্যাম্পিয়ন্স’ হতে চায়।
